….بسم الله الرحمن الرحيم….
★ আল্লাহ (الله) যিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী। তিনি সর্বদা জীবিত ছিলেন, বর্তমানে জীবিত আছেন ও সর্বদা জীবিত থাকবেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ
অর্থ, আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী। -(সূরা বাকারাহ: ২৫৫)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ
অর্থ, আর তুমি ভরসা করো সেই চিরঞ্জীবের ওপর, যিনি মরবেন না। -(সূরা ফুরকান: ৫৮)
★ তার কোন শুরু নেই, কোন শেষও নেই।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ
অর্থ, তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ। -(সূরা হাদীদ: ৩)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দোয়ায় বলতেন: “হে আল্লাহ! আপনিই প্রথম, আপনার পূর্বে কিছু নেই। আর আপনিই শেষ, আপনার পরে কিছু নেই।” -(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭১৩)
★ তিন এক, অদ্বিতীয়। তার কোন শরীক নেই।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
অর্থ, বলো, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। -(সূরা ইখলাস: ১)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَٰهٍ ۚ إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَٰهٍ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ ۚ
অর্থ, আর তাঁর সাথে অন্য কোনো ইলাহও নেই। যদি থাকত, তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজের সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেত এবং একে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করার চেষ্টা করত। -(সূরা মুমিনূন: ৯১)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
অর্থ: যদি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ বা উপাস্য থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত। -(সূরা আম্বিয়া: ২২)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
وَإِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ
অর্থ: আর তোমাদের ইলাহ হচ্ছেন এক ইলাহ। তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি পরম দয়াময়, অতি দয়ালু। -(সূরা বাকারাহ: ১৬৩)
মুয়ায বিন জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বান্দার ওপর আল্লাহর হকের কথা বলতে গিয়ে শরিক না করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন,
حَقُّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوهُ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا
অর্থ: বান্দার ওপর আল্লাহর হক হলো, তারা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে অন্য কোনো কিছুকে শরিক বা অংশীদার করবে না। -(বুখারী, মুসলিম)
★ তিনি কাউকে জন্ম দেন নাই, তাকেও কেউ জন্ম দেয় নাই।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ
অর্থ, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। -(সূরা ইখলাস: ৩)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِن وَلَدٍ
অর্থ, আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি। -(সূরা মুমিনূন: ৯১)
★ আল্লাহ নিজে নিজে সৃষ্টি হন নাই।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ
অর্থ: তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ। -(সূরা হাদীদ: ৩)
ব্যাখ্যা: আল্লাহ হলেন আল-আউওয়াল বা প্রথম। তাঁর প্রথম হওয়ার অর্থ হলো, তাঁর পূর্বে আর কিছুই ছিল না। যদি তিনি নিজে নিজে সৃষ্টি হতেন, তবে তাঁর সৃষ্টির আগের একটি সময় থাকত, যা এই আয়াতের পরিপন্থী। তিনি শুরু ছাড়াই প্রথম।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা করতে গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আনতাল আউওয়ালু ফาลัยসা কাবলাকা শাইউন।
আরবি: اللَّهُمَّ أَنْتَ الأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনিই প্রথম, আপনার পূর্বে কোনো কিছুই নেই। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭১৩)
ব্যাখ্যা: এই হাদীসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে আল্লাহর আগে কোনো শূন্যতা বা সময় ছিল না যে সময়ে তিনি সৃষ্টি হবেন। সুতরাং তুনি নিজে নিজে সৃষ্টি হননি।
সৃষ্টির একটি চেইন বা ধারাবাহিকতা থাকে। যেমন, ক-কে সৃষ্টি করেছে খ, খ-কে গ। কিন্তু এই ধারাবাহিকতা কোথাও না কোথাও গিয়ে এমন একজনের ওপর থামতে হবে, যিনি নিজে সৃষ্টি নন বরং সবকিছুর শুরু। তিনি যদি নিজে সৃষ্টি হতেন, তবে এই পুরো মহাবিশ্বের অস্তিত্বই কোনোদিন সম্ভব হতো না। সেই অনাদি ও চিরন্তন সত্তাই হলেন আল্লাহ।
★আল্লাহকে কেউ সৃষ্টি করে নাই।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ
অর্থ: তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ। -(সূরা হাদীদ: ৩)
ব্যাখ্যা: আল্লাহ হলেন আল-আউওয়াল বা প্রথম, যার কোনো শুরু নেই। কোনো সত্তাকে কেউ সৃষ্টি করলে তাঁর একটি শুরু বা সূচনা থাকে। কিন্তু আল্লাহ সব শুরুর আগে থেকেই আছেন, তাই তাঁকে কেউ সৃষ্টি করেনি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর গুণগান গাইতে গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:
اللَّهُمَّ أَنْتَ الأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনিই প্রথম, আপনার পূর্বে কোনো কিছুই নেই। -(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭১৩)
ব্যাখ্যা: এই হাদীসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে আল্লাহর আগে কোনো অস্তিত্বই ছিল না। যেহেতু তাঁর আগে কেউ বা কিছুই ছিল না, তাই তাঁকে অন্য কারো পক্ষে সৃষ্টি করা অসম্ভব।
শয়তানের কুভাবনার জবাব: মানুষের মনে যে এই অবান্তর প্রশ্নটি আসতে পারে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা আগে থেকেই জানতেন এবং এর স্পষ্ট সমাধান ও দলিল দিয়ে গেছেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মানুষ একে অপরকে প্রশ্ন করতে থাকবে, এমনকি একপর্যায়ে বলা হবে, আল্লাহ এই সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করেছেন, তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন তারা এই কথা বলবে, তখন সে যেন বলে—
آمَنْتُ بِاللَّهِ
অর্থ: আমি আল্লাহর ওপর ঈমান আনলাম (যে, আল্লাহকে কেউ সৃষ্টি করনি এবং সে যেন শয়তানের এই ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়)। -(বুখারী ও মুসলিম)
ব্যাখ্যা: এই হাদীসটি স্পষ্ট করে যে, আল্লাহকে কেউ সৃষ্টি করেছে—এমন ধারণা করাটাই ঈমানের পরিপন্থী এবং এটি শয়তানের পক্ষ থেকে আসা একটি বিভ্রান্তি মাত্র। আল্লাহ হলেন সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, তিনি নিজে সৃষ্টি নন অর্থাৎ তাকে কেউ সৃষ্টি করে নাই।
★ বরং তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তিনিই খালিক তথা সৃষ্টিকর্তা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا
অর্থ: আর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তা নির্ধারণ করেছেন যথাযথ অনুপাতে। -(সূরা ফুরকান: ২)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ ۖ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
অর্থ: এবং তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে তিনি সুজ্ঞাত।
-(সূরা আনআম: ১০১)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ فَاعْبُدُوهُ
অর্থ, তিনিই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, অতএব তোমরা তাঁরই ইবাদাত করো। -(সূরা আনআম: ১০১)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
اَللهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ
অর্থ, “আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক।” -(সূরা ঝুমার: ৬২)
★ এই সৃষ্টি জগতকে আল্লাহ তায়ালা অনর্থক সৃষ্টি করে নাই। বরং কোন না কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থ, ”হে আমাদের পালনকর্তা! আপনি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র! সুতরাং আপনি আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।” -(সূরা আল-ইমরান: ১৯১)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ
অর্থ, ”তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে কেবল অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?” -(সূরা মুমিনুন: ১১৫)
মহাবিশ্ব সৃষ্টির পেছনে যে একটি গভীর সত্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে, তা আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কার করেছেন:
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ * مَا خَلَقْنَاهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
অর্থ, ”আমি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী কোনো কিছুই খেল-তামাশার ছলে সৃষ্টি করিনি। আমি এ দুটি যথাযথ উদ্দেশ্যেই (সত্যের সাথে) সৃষ্টি করেছি, কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।” -(সূরা দুখান: ৩৮-৩৯)
★এই সৃষ্টি জগতের মধ্যে শুধু জীন ও মানুষকে শুধুমাত্র তার ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহর তায়ালা বলেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
অর্থ, “আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” — (সূরা আজ-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)
★ তিনিই হলেন মাবূদ, আমরা হলাম তার আবদ।
আল্লাহ তয়ালা বলেন,
إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي
অর্থ, ”নিশ্চয়ই আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। অতএব আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণের জন্য সালাত (নামাজ) কায়েম কর।” -(সূরা ত-হা: ১৪)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
অর্থ, আমরা কেবল আপনারই ইবাদাত করি এবং কেবল আপনারই সাহায্য চাই। -(সূরা ফাতিহা: ৫)
★ আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নিজ নিজ নবী রাসূলগনের নিকট পাঠানো দীন বা জীবনবিধান তথা ইসলামী বিধান অনুযায়ী জীনব পরিচালনা করাকে ইবাদাত বলে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
অর্থ, নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দীন একমাত্র ইসলাম। -(সূরা আল-ইমরান: ১৯)
রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমাদের এই দীনে এমন নতুন কিছু তৈরি করল যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” -(সহীহ বুখারী)
অর্থাৎ নবীজির দেখানো নিয়ম ছাড়া ইবাদত কবুল হয় না।
প্রখ্যাত ফকীহ আল্লামা ড. ওয়াহবা যুহায়লী (রহ.) ইবাদতের পরিধি ও এর ব্যাপকতা বর্ণনা করতে গিয়ে ফিকহের আলোকে লিখেছেন:
“العبادة في الإسلام لا تقتصر على الشعائر التعبدية من صلاة وصوم وزكاة وحج، بل إنها تشمل كل عمل صالح يعمله المسلم بنية صادقة لخدمة نفسه أو مجتمعه، طاعة لله تعالى وتطبيقاً لشريعته.”
অর্থ, “ইসলামে ইবাদত কেবল নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজের মতো আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং একজন মুসলমান আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য এবং তাঁর শরীয়তের বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সহীহ নিয়তে নিজের বা সমাজের কল্যাণে যে সৎ কাজই করে, তা-ই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।” -(আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু)
হানাফী ফিকহের সুপ্রসিদ্ধ কিতাব ‘ফাতাওয়া শামী’-তে আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) ইবাদত ও দ্বীন পালনের সম্পর্ক এবং মুবাহ (সাধারণ বৈধ) কাজও নিয়তের মাধ্যমে কীভাবে ইবাদতে পরিণত হয়, তা উল্লেখ করেছেন:
”كل ما يتقرب به إلى الله تعالى مما شرعه فهو عبادة… حتى إن المباحات كالطعام والشراب والنوم إذا نوي بها التقوي على الطاعة تصير عبادة.”
অর্থ “আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত শরিয়তের যে কোনো বিধান, যার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করা যায়, তা-ই ইবাদত… এমনকি পানাহার বা ঘুমের মতো সাধারণ বৈধ কাজও যখন আল্লাহর আনুগত্যের শক্তি অর্জনের নিয়তে করা হয়, তখন তাও ইবাদতে পরিণত হয়।” -(রাদ্দুল মুহতার)
★ ইসলামী বিধানের উৎস হলো চারটি। মূল দুটি – কুরআন ও হাদীস এবং শাখা দুটি- ইজমা ও কিয়াস।
কুরআন এবং হাদীস যে ইসলামী শরীয়তের মূল ও প্রধান দুটি উৎস, তা ইসলামে সর্বসম্মত ও স্বতঃসিদ্ধ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্য থেকে যারা উলুল আমর (কর্তৃত্বের অধিকারী/আলেম) তাদেরও। এরপর যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হও, তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও—যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো।” -(সূরা নিসা: ৫৯)
এখানে “আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া” অর্থ পবিত্র কুরআন এবং “রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া” অর্থ তাঁর সুন্নাহ বা হাদীস।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজ্জের ভাষণে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
”আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতকাল তোমরা এ দুটি আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততকাল তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না; তা হলো আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাত (হাদীস)।” (মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদীস নং: ৩৩৩৩; মুস্তাদরাকে হাকিম)
কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশনা থেকেই ইজমা ও কিয়াসের উৎপত্তি। এই দুটিকে শরীয়তের উৎস হিসেবে গ্রহণ করার মূল ভিত্তিই হলো কুরআন ও সুন্নাহ।
ক. ইজমা (উম্মতের আলেমদের ঐক্যমত):
শরীয়তের কোনো বিষয়ে কোনো এক যুগের সমস্ত মুজতাহিদ (ইসলামী গবেষক) আলেমদের একমত হওয়াকে ইজমা বলে।
”কারও কাছে সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, তবে সে যেদিক ফিরে যায় আমি তাকে সেদিকেই ফিরিয়ে দেবো এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো…” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৫)
এই আয়াতে “মুমিনদের পথের বিপরীত পথ” অনুসরণ করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে মুমিনদের (বিশেষ করে আলেম ও মুজতাহিদদের) সম্মিলিত পথ বা সিদ্ধান্ত (ইজমা) মানা ওয়াজিব।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
”নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতকে কোনো ভ্রষ্টতার ওপর একত্রিত করবেন না। আর জামাআতের (দলের) ওপর আল্লাহর হাত রয়েছে।” (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ২১৬৭)
এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, উম্মতের আলেম সমাজ সম্মিলিতভাবে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তাই তাদের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত শরীয়তের একটি শক্তিশালী দলীল।
খ. কিয়াস (যৌক্তিক অনুমান বা সাদৃশ্য):
কুরআন, হাদীস বা ইজমায় সরাসরি কোনো বিধান পাওয়া না গেলে, সেগুলোর কোনো একটির সাথে নতুন উদ্ভূত কোনো বিষয়ের কারণ বা ইল্লতের (মূল কারণ) মিল দেখে সাদৃশ্য বিধান তৈরি করাকে কিয়াস বলে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ”অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।” (সূরা আল-হাশর, আয়াত: ২)
এখানে আরবী শব্দ ‘ফাতাবিরূ’ (শিক্ষা গ্রহণ করো/উপলব্ধি করো) দ্বারা গভীর চিন্তা ও এক বিষয়কে অন্য বিষয়ের সাথে তুলনা করার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা কিয়াসের মূল ভিত্তি।
হাদীসের দলীল (সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রমাণ):
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন হযরত মু’আয ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনের বিচারক হিসেবে পাঠাচ্ছিলেন, তখন তাদের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক কথোপকথন হয়েছিল:
রাসূল (সা.): “তুমি কিসের ভিত্তিতে ফয়সালা করবে?”
হযরত মু’আয (রা.): “আল্লাহর কিতাব (কুরআন) অনুযায়ী।”
রাসূল (সা.): “যদি আল্লাহর কিতাবে তা না পাও?”
হযরত মু’আয (রা.): “তাহলে আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ (হাদীস) অনুযায়ী।”
রাসূল (সা.): “যদি আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহতেও না পাও?”
হযরত মু’আয (রা.): “তাহলে আমি আমার নিজের রায় বা বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে ইজতিহাদ (গবেষণা/কিয়াস) করবো এবং এতে কোনো কমতি করবো না।”
হযরত মু’আয (রা.)-এর এই উত্তর শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং তাঁর বুকে হাত দিয়ে বললেন: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আল্লাহর রাসূলের প্রতিনিধিকে এমন তৌফিক দিয়েছেন যাতে আল্লাহর রাসূল সন্তুষ্ট।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৩৫৯২; সুনানে তিরমিযী)
★ ইসলামী বিধানের ফিকহি বিশ্লেষণমুলক মাযহাব হলো চারটি। যথা- হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী। এই চার মাযহাবের যেকোন এক মাযহাব মানা ওয়াজিব।
চারটি মাযহাবই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত এবং হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সাধারণ মানুষ (যারা সরাসরি কুরআন-হাদীস থেকে ইজতিহাদ করে আহকাম বের করতে পারে না) তাদের জন্য যেকোনো একটি নির্ভরযোগ্য মাযহাব বা মুজতাহিদ আলেমের অনুসরণ (তাকলীদ) করা আবশ্যক।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
অর্থ, অতএব তোমরা জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো, যদি তোমরা না জানো। -(সূরা নাহল: ৪৩)
আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ:) বলেন,
”واجب على مقلد التزام مذهب معين”
অর্থ, “একজন মুকাল্লিদ (সাধারণ মানুষ)-এর জন্য নিনর্দিষ্ট একটি মাযহাব অনুসরণ করা ওয়াজিব।” -(রদ্দুল মুহতার: ১/৪৮)
★ ইসলাম একটি পুর্নাঙ্গ জীবনব্যবস্থা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
অর্থ, আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন হিসেবে মনোনীত করলাম। -(সূরা মায়িদাহ: ৩)
★ আর ইসলামের মধ্যে পূর্নাঙ্গভাবে প্রবেশ করতে হবে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً
অর্থ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামের মধ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রবেশ করো। -(সূরা বাকারাহ: ২০৮)
যারা দ্বীনের কিছু অংশ মানে আর কিছু অংশ নিজেদের ইচ্ছেমতো বাদ দেয়, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন:
”…তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখো আর কিছু অংশ অস্বীকার করো? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এমনটি করে, পার্থিব জীবনে তাদের প্রতিদান হীনতা ও লাঞ্ছনা ছাড়া আর কিছুই নয়…” (সূরা আল-বাকারা: ৮৫)
★ ইসলামের মধ্যে পূর্নাঙ্গভাবে প্রবেশ করার রূপরেখা হলো, ইসলামী বিধান পূর্নাঙ্গভাবে জানতে ও মানতে হবে এবং অপরদেরকে জানাতে ও মানাতে হবে। ইসলামী বিধান অপরকে জানানো ও মানানোর পন্থা হলো দুটি, দাওয়াহ ও জিহাদ।
আল্লাহ তাআলা মানবজাতির প্রতি অবতীর্ণ প্রথম আয়াতেই জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন:
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ
“পাঠ করো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আল-আলাক: ১)
দ্বীনের মৌলিক ও প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ বা আবশ্যিক কর্তব্য। হাদীসে এসেছে:
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
“দ্বীনি জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ।” (সুনান ইবনে মাজাহ: ২২৪)
আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ জানার পর তা নিঃশর্তভাবে মানা মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো; আর তোমরা তোমাদের আমলগুলোকে বিনষ্ট করো না।” (সূরা মুহাম্মদ: ৩৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট নির্দেশ:
বিদায় হজ্জের ভাষণে এবং বিভিন্ন সময়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) উম্মতকে দ্বীন প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন। সহীহ বুখারীর হাদীসে এসেছে:
بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً
“আমার পক্ষ থেকে (মানুষের কাছে) পৌঁছে দাও, তা যদি একটি মাত্র আয়াতও হয়।” (সহীহ বুখারী: ৩৪৬১)
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সত্যের দিকে ডাকার নির্দেশ দিয়ে বলেন:
”তুমি তোমার রবের পথের দিকে আহ্বান করো হিকমত (প্রজ্ঞা) ও সদুপদেশের মাধ্যমে…” (সূরা আন-নাহল: ১২৫)
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই করো যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দীন আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।” (শরিয়তের নিয়মতান্ত্রিক ও বৈধ পন্থায়)। -(সূরা বাকারা: ১৯৩)
★ যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদাত পুর্নাঙ্গভাবে করবে আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হবেন এবং তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের ফালাহ তথা কল্যান দান করবেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“মুমিন হয়ে পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই এক পবিত্র জীবন (দুনিয়ায়) দান করব এবং অবশ্যই আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার (আখিরাতে) দেব।” -(সূরা নাহল: ৯৭)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
“…তোমাদের রবের ইবাদাত করো এবং সৎকাজ করো, যাতে তোমরা সফলকাম (ফালাহ অর্জন) হতে পারো।” -(সূরা হজ্জ: ৭৭)
★ আরযে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদাত করবে না আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট হবেন এবং সে দুনিয়া ও আখিরাতের খুছর তথা ধ্বংসের মধ্যে নিমজ্জিত হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, নিশ্চয়ই তার জীবন হবে সংকীর্ণ (দুনিয়ায়) এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় উঠাব।” -(সূরা ত-হা: ১২৪)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
“সময়ের কসম, নিশ্চয়ই মানুষ চরম ক্ষতি ও ধ্বংসের মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে…”। -(সূরা আসর: ১-৩)
……فقط. والله اعلم بالصواب …….
🖍️ লিখনে-
মুফতী রিয়াজুল ইসলাম হানাফী
মাদারীপুরী
👉🏿শরয়ী মাসয়ালার সামাধান জানতে যোগাযোগ করুন –
📱+8801339868000 (Whatsapp)
📧 contact.hanafifatawa@gmail.com



