শরীয়তের মাসায়েলের প্রকারভেদ

1783671807411 শরীয়তের মাসায়েলের প্রকারভেদ

❓প্রশ্ন: শরীয়াতের মাসায়িল কয় প্রকার?

 

✍️উত্তর:….بسم الله الرحمن الرحيم…..

শরয়ী মাসায়িলের প্রকারভেদ নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

ইসলামি শরীয়তের বিধানাবলিকে বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের সাথে এর সম্পৃক্ততার দিক থেকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ইসলামি আইনশাস্ত্র ও জীবনব্যবস্থায় এই বিভাগগুলো মানুষের সামগ্রিক জীবনকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয়। নিচে এই বিভাগগুলোর দিক ও প্রকৃতি আলোচনা করা হলো:

  • ​ঈমানিয়াত (বিশ্বাস): এটি ইসলামের মূল ভিত্তি বা বিশ্বাসের বিষয়। এর সাথে সম্পর্ক হলো মানুষের আকিদা বা বিশ্বাসের। এটি মূলত হৃদয়ের সাথে সম্পর্কিত, যার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, নবী-রাসূল, পরকাল ও তকদিরের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।
  • ​ইবাদাত (উপাসনা): এটি বান্দার সাথে আল্লাহর সরাসরি সম্পর্কের ক্ষেত্র। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্ব প্রকাশ করা (যেমন—নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত)।
  • ​মুয়ামেলাত (লেনদেন): এটি মানুষের সাথে মানুষের পারস্পরিক আর্থিক, ব্যবসায়িক ও সামাজিক লেনদেন এবং অধিকার সম্পর্কিত ক্ষেত্র। এর উদ্দেশ্য হলো সমাজে ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা (যেমন—বেচাকেনা, বিবাহ, উত্তরাধিকার আইন)।
  • ​মুয়াশারাত (সামাজিক আচরণ): এটি মানুষের সাথে মানুষের সামাজিক মেলামেশা, শিষ্টাচার এবং সমষ্টিগত জীবনযাত্রার নিয়মাবলি নির্দেশ করে। এটি পারিবারিক ও সামাজিক পরিমন্ডলে একে অপরের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হয়, তার নীতিমালা নির্ধারণ করে।
  • ​আখলাক (চরিত্র): এটি মানুষের নৈতিকতা ও অভ্যন্তরীণ গুণাবলি সংক্রান্ত। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি ও চরিত্রকে সুন্দর করা, যা ইসলামের শিক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

​কুরআন ও হাদীসের অকাট্যতা এবং দলিলের শক্তির ওপর ভিত্তি করে মাসায়েলকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:

  • ​ক্বত্বঈ মাসায়েল (قطعي):  যাতে কুরআন কারীম বা সুন্নতে নববিয়াহর কোনো অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন ‘নস’ বিদ্যমান থাকে। এ ধরনের মাসাইলকে মানসূস আলাইহও (যার উপর দলীল রয়েছে) বলা হয় এবং ‘মুজমা আলাইহি” (সর্বসম্মত)ও বলা হয়ে থাকে। এ বিষয়ে কোনো ইমাম, ফকীহ, বা আলিমের কোনো মতভেদ থাকে না। যদি কেউ জেনে শুনে দ্বিমত করে তবে তিনি আলিমই গণ্য হবেন না; বরং তার সাথে ‘ফাসিক’ বিশেষণ যুক্ত হবে। যেমন—নামাজ ফরজ হওয়া, যাকাতের অকাট্যতা, চুরির হারাম হওয়া ইত্যাদি। এই বিষয়গুলোতে কোনো ইজতিহাদ বা গবেষণার সুযোগ নেই।
  • ​যন্নি মাসায়েল (ظني): যাতে হয়তো কোনো নস নেই বা থাকলেও তা হয়তো এমন স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন নয়, যাতে একাধিক মর্মের সম্ভাবনা নেই, কিংবা তা প্রামাণিকতার দিক থেকে এমন অকাট্য ও শক্তিশালী নয়, যার ছূবুত ও প্রামাণিকতা হাদীস-বিচারকগণের কাছে সর্বসম্মত। এ ধরনের বিষয়ে ফিকহ-ফতোয়ার ইমামগণ ইজতিহাদের ভিত্তিতে ফয়সালা করেন। এই ফয়সালায় তারা সবাই একমত থাকলে বিষয়টি ‘মুজতাহাদ ফীহ’ (ইজতিহাদী) হওয়া সত্ত্বেও ‘মুজমা আলাইহি’ গণ্য হবে। আর তাদের মাঝে মতানৈক্য হলে বিষয়টি হবে ‘মুজতাহাদ ফীহ” এবং ‘মুখতালাফ ফীহ”। এসব মাসআলার দলিল বা তার অর্থ ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। ইমামগণের ইজতিহাদ বা গবেষণার ক্ষেত্র এখানেই। যেমন—কিছু ফিকহী মাসআলা যা হাদীসের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে ভিন্ন হতে পারে।

​বিধানের প্রকৃতি অনুযায়ী শরয়ী মাসায়িল পাঁচ প্রকার। উসূলে ফিকহের আলোকে শরীয়তের প্রতিটি কাজ পাঁচটি বিধানের যেকোনো একটির অন্তর্ভুক্ত হয়:

  • ​ফারজ (فرض): যা পালন করা অবশ্যক এবং অস্বীকার করলে ঈমান চলে যেতে পারে (যেমন—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ)।
  • ​ওয়াজিব (واجب): যা পালন করা আবশ্যক কিন্তু দলিলের দিক থেকে ফারজ থেকে সামান্য নিম্নস্তরের (যেমন—বিতর নামাজ বা সদকাতুল ফিতর)।
  • ​সুন্নাত (سنة): রাসূল (সা.) যা নিজে করেছেন বা করতে উৎসাহিত করেছেন।
  • ​হারাম (حرام): যা বর্জন করা কঠোরভাবে আবশ্যক।
  • ​মাকরূহ (مكروه): যা বর্জন করা উত্তম, যদিও করলে সরাসরি গুনাহ হয় না (মাকরুহে তাহরীমি ও তানযীহি)।
  • ​মুবাহ (مباح): যা করা বা না করার মধ্যে কোনো পুণ্য বা গুনাহ নেই, অর্থাৎ এটি মানুষের ইচ্ছাধীন।

​একটি মাসআলার সমাধান বের করার ক্ষেত্রে ফকীহগণ এই পর্যায়গুলো অনুসরণ করেন:

  1. ​নাস বা সুস্পষ্ট দলিল: কুরআনের আয়াত বা হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশ।
  2. ​ইজমা: সাহাবা ও উম্মতের মুজতাহিদগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।
  3. ​কিয়াস: কুরআন ও হাদীসের মূলনীতির আলোকে নতুন সমস্যার সমাধান দেওয়া।
  4. ​ইস্তিহসান বা মাসলাহাত: উম্মতের বৃহত্তর কল্যাণ বিবেচনায় শরিয়তের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক না রেখে সমাধান দেওয়া।

​হানাফী মাজহাবের মাসায়েলগুলো সাধারণত ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও তাঁর প্রধান ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। এগুলোকে ‘জাহেরুর রিওয়াহ’ (ثاهر الرواية) বলা হয়, যা নির্ভরযোগ্য দলিলের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।

মোটকথা, শরীয়তের মাসায়েলসমূহ মূলত মানুষের দুনিয়াবি ও পরকালীন জীবনের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য নির্ধারিত। উসূলে ফিকহ আমাদের শেখায় কীভাবে কুরআন ও হাদীস থেকে সঠিক বিধানটি আহরণ করতে হয়। এটি এমন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যা একদিকে যেমন ইসলামের মূলভিত্তি সংরক্ষণ করে, অন্যদিকে যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন নতুন সমস্যার সমাধান দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।

.….فقط. والله اعلم بالصواب …….

 

🖍️উত্তর লিখনে-

মুফতী রিয়াজুল ইসলাম হানাফী

মাদারীপুরী

 

(👉🏿শরয়ী মাসয়ালার সামাধান জানতে যোগাযোগ করুন –

📱+8801990270150 (Whatsapp)

📧 contact.hanafifatawa@gmail.com

WhatsApp