❓প্রশ্ন: আল্লাহ তা’য়ালা কি সব জায়গায় আছেন, নাকি শুধু আরশে আজিমে আছেন?
❓উত্তর: …بسم الله الرحمن الرحيم…
মহান আল্লাহ তায়ালার গুন প তার সৃষ্টিজগত নিয়ে আলোচনা, গবেষণা করতে হবে। কিন্তু আল্লাহর জাতি সত্তা নিয়ে আলোচনা, গবেষণা ও মনগড়া মন্তব্য করা নিষেধ।
এ সম্পর্কে হাদীসে আছে,
عن ابن عباس ان قوما تفكروا فى الله عز و جل فقال النبي (ص) تفكروا فى خلق الله و لا تتفكروا فى الله فانكم لن تقدروا قدره☆
অর্থ, হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হইতে বর্নিত, একদা কোন একদল লোক আল্লাহর সত্বা ও অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা করতেছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাদেরকে বললেন, আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করো। তার তার সত্বা ও অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা করিও না। কেননা তোমরা কখনই তার মর্যাদার আন্দাজ করতে পারবে না। -( তারগীব, তাখরীজ)
আল্লাহ তায়ালার জাতি সত্বা নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা করাকে পূর্ববর্তী মনিষীগন বিদয়াত বলেছেন। এমনটিই আমরা পূর্ববর্তী মুহাক্কিক আলেমগণ থেকে দেখতে পাই।
এ সম্পর্কে হযরত ইমাম মালিক (রহ) বলেন,
الاستواء معلوم والكيفية مجهولة، والسؤال عنه بدعة، والايمان به واجب،
অর্থ, “আল্লাহ তাআলার আরশে ইস্তিওয়া এর বিষয়টি জানা যায়, কিন্তু অবস্থা অজানা। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদআত। আর এ বিষয়ে ঈমান রাখা ওয়াজিব।”
অপর হাদীসে আছে, হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
تفكَّروا في كلِّ شيءٍ , ولا تتفكَّروا في اللهِ
অর্থ, “তোমরা সব কিছু নিয়ে গবেষণা কর। কিন্তু আল্লাহর সত্ত্বা নিয়ে গবেষণা করো না।”
ইমাম যুরকানী (রহ) বলেন, হাদীসটি হাসান লিগাইরিহী।
-(মুখতাসারুল মাকাসিদ, বর্ণনা নং-৩১৮)
তাই এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ বলে মনে করি।
যাদের মনের মাঝে ফিতনা রয়েছে। কেবল তারাই এসব মুতাশাবিহাত বিষয়ে কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করে থাকে।
কুরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছেঃ
هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُّحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ ۖ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ ۗ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ ۗ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ [٣:٧]
তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট,সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্যগুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে,তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশে তন্মধ্যেকার রূপকগুলোর। আর সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর,তারা বলেনঃ আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। এই সবই আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর বোধশক্তি সম্পন্নেরা ছাড়া অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। -(সূরা আলে ইমরান-৭)
আল্লাহ তাআলা কোথায় আছেন? এটি কুরআনের একটি মুতাশাবিহাত তথা রূপক শব্দের অন্তর্ভূক্ত। তাই আমাদের পূর্ববর্তী মুহাক্কিকগণ এটির ব্যাপারে অতি গবেষণা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন। কিন্তু যাদের মনে কূটিলতা আছে তারা ফিতনা বিস্তারের জন্য এসবকেই প্রচারণার মূল টার্গেট বানিয়ে কাজ করে যায়।
সেই কূটিল সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত প্রচলিত বিদআতি ফিরক্বা কথিত আহলে হাদীস। যাদের কাজই হল মুতাশাবিহ এবং মতভেদপূর্ণ বিষয়কে মানুষের সামনে তুলে ধরে ফিতনা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা।
কথিত আহলে হাদীস সম্প্রদায় প্রচার করে থাকে, আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান নয়। তারা দলিল হিসেবে পেশ করে থাকে সূরা হাদীদের ৩ নং আয়াত। যেখানে ঘোষিত হয়েছে আল্লাহ তায়ালা আরশের উপরে রয়েছেন। তারা কিছু আয়াত দিয়ে আরো অসংখ্য আয়াতকে অস্বিকার করে নাউজুবিল্লাহ। যেই সকল আয়াত দ্বারা বুঝা যায় আল্লাহ তায়ালা আরশসহ সর্বত্র রয়েছেন।
কিছু আয়াতকে মানতে গিয়ে আরো ১০/১২টি আয়াত অস্বিকার করার মত দুঃসাহস আসলে কথিত আহলে হাদীস নামী ফিতনাবাজ বাতিল ফিরক্বাদেরই মানায়।
অসংখ্য আয়াতে কারীমাকে অস্বিকার করে আল্লাহ তায়ালাকে কেবল আরশে সীমাবদ্ধ করার মত দুঃসাহস ওরা দেখাতে পারলেও আমরা পারি না। আমরা বিশ্বাস করি-আল্লাহ তাআলার কুরসী আসমান জমিন সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। তিনি স্থান কাল থেকে পবিত্র। আল্লাহর গোটা রাজত্বের সর্বত্র তিনি রয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা আরশে রয়েছেন একথা আমরা অস্বিকার করি না। তিনি আরশে রয়েছেন। তিনি এছাড়াও সর্বত্র রয়েছেন। তাহলে আমরা সকল আয়াতকেই মানি। আর ওরা শুধু আরশ সংশ্লিষ্ট কিছু আয়াত মানে, বাকিগুলোকে অস্বিকার করে।
কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকা সকল কিছুকে পরিবেষ্টনকারী স্রষ্টার জন্য কিছুতেই মানানসই হতে পারে না।
আল্লাহ তায়ালা আরশ সহ সর্বত্র বিরাজমান এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ
অর্থ, অতঃপর তিনি আরশের উপর ক্ষমতাশীল হোন। -(সূরা হাদীদ-৩)
তিনি আরো বলেন,
وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ
অর্থ, আল্লাহ তায়ালার কুরসী আসমান জমিন ব্যাপৃত। -(সূরা বাকারা-২৫৫)
তিনি আরো বলেন,
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَان
অর্থ, আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে।
-(সূরা বাকারা-১৮৬)
তিনি আরো বলেন,
وَنَحنُ أَقرَبُ إِلَيهِ مِن حَبلِ الوَرِيْدِ
অর্থ, আর আমি বান্দার গলদেশের শিরার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী। -(সূরা কাফ-১৬)
তিনি আরো বলেন,
فَلَوْلا إِذَا بَلَغَتِ الْحُلْقُومَ (83) وَأَنْتُمْ حِينَئِذٍ تَنْظُرُونَ (84) وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْكُمْ وَلَكِنْ لا تُبْصِرُونَ (85)
অর্থ, অতঃপর এমন কেন হয়না যে, যখন প্রাণ উষ্ঠাগত হয়। এবং তোমরা তাকিয়ে থাক। এবং তোমাদের চেয়ে আমিই তার বেশি কাছে থাকি। কিন্তু তোমরা দেখতে পাওনা। -(সূরা ওয়াকিয়া-৮৩,৮৪,৮৫)
তিনি আরো বলেন,
وَللَّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ فَأَيْنَمَا تُوَلُّواْ فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
অর্থ, পূর্ব এবং পশ্চিম আল্লাহ তায়ালারই। সুতরাং যেদিকেই মুখ ফিরাও,সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞাত। -(সূরা বাকারা-১১৫)
তিনি আরো বলেন,
وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنْتُمْ
অর্থ, তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন। -(সূরা হাদীদ-৪)
তিনি আরো বলেন,
إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
অর্থ, যখন তিনি তার সাথীকে বললেন-ভয় পেয়োনা, নিশ্চয় আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন। -(সূরা হাদীদ-৪০)
তিনি আরো বলেন,
قوله تعالى مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلاثَةٍ إِلاَّ هُوَ رَابِعُهُمْ وَلا خَمْسَةٍ إِلاَّ هُوَ سَادِسُهُمْ وَلا أَدْنَى مِن ذَلِكَ وَلا أَكْثَرَ إِلاَّ هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ( المجادلة – 7
অর্থ, কখনো তিন জনের মাঝে এমন কোন কথা হয়না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন, এবং কখনও পাঁচ জনের মধ্যে এমন কোনও গোপন কথা হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন। এমনিভাবে তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি, তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে অবহিত করবেন তারা যা কিছু করত। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু জানেন। -(সূরা মুজাদালা-৭)
…..فقط. والله اعلم بالصواب ……..
🖍️উত্তর লিখনে-
মুফতী রিয়াজুল ইসলাম হানাফী
মাদারীপুরী
(👉🏿শরয়ী মাসয়ালার সামাধান জানতে যোগাযোগ করুন –
📱01339868000 (Whatsapp)
📧 contact.hanafifatawa@gmail.com


