❓প্রশ্ন: ফেরেশতাদের বেপারে কি কি বিশ্বাস রাখতে হবে?
✍️উত্তর: …بسم الله الرحمن الرحيم…
ফেরেশতা’ মূলত একটি ফারসি শব্দ। এর আরবি হলো ‘মালাকুন’। যার অর্থ বার্তাবাহক। এর বহুবচন হলো ‘মালাইকা’। কুরআন ও হাদিসে ‘মালাইকা’ শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামের পরিভাষায় ফেরেশতা বলা হয،
هو جسم نورنى متشكل باشكال مختلفة يفعلون ما يؤمرون و لا يعصون الله ما امرهم
অর্থ, “এমন নূরানী মাখলূক, তারা সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ পালনে রত থাকেন ও তারা কখনোই আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করেন না।”
দ্বিতীয় মৌলিক যে বিষয়ে ঈমান রাখতে হয় তা হল ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান৷ আল্লাহ ইরশাদ, ‘…কেউ আল্লাহ, তার ফেরেশতা, তার কিতাবগুলো, তার রাসুলদের ও পরকালে বিশ্বাস না করলে সে তো মারাত্মকভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে। -(সুরা নিসা: ১৩৬)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘রাসুল, তাঁর প্রতি তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে ঈমান এনেছে এবং মুমিনরাও। তাদের সবাই আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাব ও তাঁর রাসুলদের প্রতি ঈমান এনেছে।’
-(সুরা : বাকারা : ২৮৫)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে কোনো পুণ্য নেই; কিন্তু পুণ্য আছে কেউ আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতারা, সব কিতাব এবং নবীদের প্রতি ঈমান আনলে।’
-(সুরা : বাকারা: ১৭৭)
ফেরেশতাদের অস্তিত্ব এবং তাঁদের ব্যাপারে কোরআন-হাদিসে যা বর্ণিত হয়েছে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা অপরিহার্য। ফেরেশতাদের প্রতি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বিশ্বাস হলো,
১. ফেরেশতারা আল্লাহ তায়ালার এক সম্মানিত সৃষ্টি। ফেরেশতাদের সম্মানের কথা উল্লেখ করে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘(এ কোরআন) মহান, পূত-পবিত্র লিপিকারের ( ফেরেশতার) হাতে লিপিবদ্ধ। ’ -(সুরা আবাসা : ১৫-১৬)
২. মানুষ সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ অগণিত মালাইকা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাঁদেরকে ‘নুর’ দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।
এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে, ‘ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, আল্লাহর নুর বা ঐশী আলো থেকে। ’
-(মুসলিম শরিফ, হাদিস : ২৯৯৬)
২. ফেরেশতারা আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। ফেরেশতাগণ মাসূম বা নিষ্পাপ।আল্লাহ যে ফেরেশতাকে যে কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন তারা সদা সে কাযেই নিয়োজিত থাকেন। তাঁরা কখনো আল্লাহর অবাধ্য হয় না।
এ ব্যাপারে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
لا يسبقونه بالقول وهم بامره يعملون
অর্থ, তারা আগে বেড়ে কথা বলে না। তারা তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে থাকে।
-(সূরা আম্বিয়া : ২৭)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
لا يستكبرون عن عبادته ولا يستحسرون
অর্থ, তারা ইবাদত করা থেকে বিমুখ হয় না এবং ক্লান্তিও বোধ করে না। -(সূরা আম্বিয়া: ১৯)
হারুত ও মা’রূত সহীহ মত অনুসারে দুজন ফেরেশতা ছিলেন। তাদের থেকে কোন
কুফর বা গোনাহে কাবীরা সংঘটিত হয়নি। তাদের শাস্তি গোনাহের কারণে নয়, বরং সেটা তিরস্কার স্বরূপ হয়েছে। যেমন নবীদের বিচ্যুতির ফলে তিরস্কার হয়ে থাকে।
-(শরহুল আকাইদিন নাসাবফিয়্যাহ)
তদুপরি উক্ত ফেরেশতাদ্বয়ের সাথে জোহরা নাম্নী নারীর প্ররোচনা সংক্রান্ত রেওয়ায়াতটি বায়যাবী প্রমুখ সহীহ নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
৩. আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার মত কোন কুপ্রবৃত্তি তাদের মাঝে নেই। তাঁরা মানবীয় দুর্বলতা ও কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত। তারা ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত হয় না।
৪. তারা পুরুষও নন নারীও নন। তারা কাম, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি রিপু থেকে মুক্ত। ফেরেশতাদেরকে নারী বা পুরুষ আখ্যায়িত করা যায় না। কেননা এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীছে কোন ভাষ্য কিংবা কোন যুক্তি বর্তমান নেই।
৫. তারা বিভিন্ন আকার ধারণ করতে পারেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) বিভিন্ন আকৃতিতে নবী কারীম (সাঃ)-এর দরবারে হাযির হতেন। অধিকাংশ সময় তিনি হযরত দেহ্ইয়ায়ে কাল্ল্কী (রাঃ)-এর আকৃতিতে আসতেন। হাদীছে জিব্রীল নামক প্রসিদ্ধ হাদীছে তার এক বেদুঈনের বেশে আসার কথা উল্লেখিত আছে।
৬. তারা কোন মায়ের পেটেও জন্মায় নাই এবং তাদের কোন স্ত্রী সন্তানও নেই।
৭. মানুষের মতো রক্ত-মাংসের সৃষ্টি না হওয়ায়, তাদের কামনা-বাসনা, পানাহারের প্রয়োজনীয়তা ও ঘুম-বিশ্রাম কিছুই নেই।
৮. তারা সংখ্যায় অনেক। হাদীছে বর্ণিত আছে, সাত আসমানের সর্বত্র এত ফেরেশতা ইবাদতে রত আছেন যে, সামান্য অর্ধহাত জায়গাও খালী নেই। তাদের প্রকৃত সংখ্যা আল্লাহ্ ব্যতীত কারও জানা নেই।
কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে, তিনি (আল্লাহ) ব্যতীত তোমার প্রতিপালকের সৈন্যবাহিনী (ফেরেশতা) সম্বন্ধে কেউ অবগত নয়। -(সূরা মুদ্দাছিরঃ ৩১)
৯. ফেরেশতাদের মধ্যে প্রধান ফেরেশতা হলো চার জন। যথা-
ক. হযরত জিবরাইল (আ) যিনি ওহী ও আল্লাহর আদেশ বহন করে নবী রাসূলদের
নিকট আসতেন। এছাড়া আল্লাহ যখন যে নির্দেশ প্রদান করেন তা কর্তব্যরত ফেরেশতার নিকট পৌঁছান।
নির্দেশে মাখলূকের জীবিকা সরবরাহের দায়িত্বে নিযুক্ত।
তাকে ‘মালাকুল মউত’ বলা হয়েছে। আছারে সাহাবার মধ্যে আযরাঈল নামটি পাওয়া যায়।
১০. আল্লাহ্ তাদেরকে বিপুল শক্তির অধিকারী বানিয়েছেন।
১১. আল্লাহ্ তাদেরকে সৃষ্টি করে বিভিন্ন কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন- কতিপয় আযাবের কাজে, কতিপয় রহমতের কাজে নিযুক্ত আছেন, কতিপয় আমলনামা লেখার কাজে নিযুক্ত, তাদেরকে “কিরামান কাতিবীন” বলা হয়। কেউ আল্লাহর আরশ বহনের দায়িত্বে নিয়োজিত। এমনিভাবে সৃষ্টির বিভিন্ন কাজে ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ পাক
নিয়োজিত করে রেখেছেন।
★ দুনিয়ার প্রতিটি ধর্ম মতেই বিশেষ করে গ্রীক দর্শনেও এ জাতীয় সত্তা সমূহের
অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়েছে। সাবিয়ী ধর্ম মতে এ শ্রেণীর মাখলুককে তারকাপুঞ্জ হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। তারা ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে কুরবানী দিত। তাদের প্রতিকৃতি তৈরী করত এবং তাদেরকে একটি দৃশ্যমান প্রভূ বা “খোদার প্রকাশ” মনে করত।
ইউনানী মিশরী (ইসকান্দারী) দর্শনে তাদের নাম রাখা হয়েছে “উকূলে আশারা” চক্র বা দশ বুদ্ধি আকল।
পার্শিয়ানরা ফেরেশতাদেরকে “ইমশাস পান্দ” নামে অভিহিত করত এবং
তাদের ধারণা মতে ফেরেশতাদের সংখ্যা অসংখ্য ও অগণিত । পার্শিয়ানরা ফেরেশতাদেরকে পূজা-অর্চনার যোগ্য বলে মনে করত। তাদের ধর্ম মতে সর্বাধিক মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতা হলেন ছয়জন। তাদের প্রত্যেকের অধীনে রয়েছে তেত্রিশজন করে ফেরেশ্তা।
পার্শিয়ানদের ধর্ম মতে ভাল-মন্দের প্রভৃ একজন নয় বরং দুইজন এবং তাদের প্রত্যেকের অধীনে রয়েছে অসংখ্য ফেরেশতা। এই উভয় শ্রেণীর প্রভৃ নিজ নিজ সৈন্য সামন্তসহ সর্বদাই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে থাকে। এমনিভাবে তারা নর ও মাদী ফেরেশ্তার অস্তিত্বকে স্বীকার করে এবং তারা বলে, মাদী ফেরেশতা নর ফেরেশতার স্ত্রী।
ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের লোকেরা ফেরেশতাদেরকে করভীম বলে এবং বিশিষ্ট ফেরেশতাদেরকে জিব্রাঈল, মীকাঈল ইত্যাদি নামে অভিহিত করে। তারা মর্যাদা ও সম্মানের মস্তক অবনত করে তাদেরকে এমন ভাবে আহবান করে যেমনটি আল্লাহর শানে করা হয়ে থাকে ।
খৃষ্টান সম্প্রদায়ও ফেরেশ্তাদের অস্তিত্বকে স্বীকার করে এবং বিশেষ বিশেষ ফেরেশ্তাকে জিব্রাঈল রূহুলকুস ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করে থাকে।
হিন্দু ধর্মে ফেরেশতাদের সম্পর্কে নানান ধরনের উদ্ভট কল্পনা করা হয়ে থাকে। জাহিলী যুগের পূর্বে আরবরা ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে অভিহিত করত। তাদের পূজা-আর্চনা করত এবং এমন আকীদাও পোষণ করত যে, তারা আল্লাহর দরবারে তাদের জন্য সুপারিশকারীর ভূমিকা পালন করবে ।
পক্ষান্তরে ইসলাম ফেরেশতাদের সম্বন্ধে এ সকল মতাদর্শকে ভ্রান্ত ধারণা এবং অসার বলে ঘোষণা করেছে। এ সকল ভ্রান্ত ধারণরা মূলোচ্ছেদ কল্পে কুরআনে কারীমের বহু আয়াত নাযিল হয়েছে। প্রমাণ করা হয়েছে যে, প্রভৃত্ব ও খোদায়ীত্বের কোন গুণ ফেরেশতাদের
মধ্যে নেই। তারা আল্লাহর বান্দা। তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশ পালন করা। আল্লাহর নির্দেশ ব্যতিরেকে পৃথিবীতে কোন রূপ হস্তক্ষেপ করার অধিকার তাদের নেই। সুতরাং তাদের উদ্দেশ্যে ইবাদত-বন্দেগী করা এবং পূজা-অর্চনা করা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও নাজায়েয।
……..فقط. والله اعلم بالصواب ………
🖍️উত্তর লিখনে-
মুফতী রিয়াজুল ইসলাম হানাফী
মাদারীপুরী
(👉🏿শরয়ী মাসয়ালার সামাধান জানতে যোগাযোগ করুন –
📱01339868000 (Whatsapp)
📧 contact.hanafifatawa@gmail.com


