❓প্রশ্ন: ইলমে তাফসীরের সূচনা ও তার পর্যায় সমূহ কি?
✍️উত্তর:… بسم الله الرحمن الرحيم ….
তাফসীরের ক্ষেত্রে মুফাসসিরগণ যে সকল নিয়ম নীতির অনুসরণ করেছেন সে সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরী হল- লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ‘ইলমে তাফসীর’ যে সকল পর্যায় অতিক্রম করেছে সে সম্পর্কে সংক্ষেপে একটি আলোচনা পেশ করা।
‘ইলমে তাফসীর’ প্রধানত: দু’টি যুগ অতিক্রম করেছে। আর তা হল-
প্রথম যুগ হলো রেওয়ায়াতের যুগ:
এ যুগের সময় সীমা নববী যুগ থেকে শুরু করে ছাহাবায়ে কেরামের যুগ তারপর
তাবেঈদের যুগ পর্যন্ত প্রলম্বিত। এ সময় সকল ইলম (ইসলামী জ্ঞান) রেওয়ায়াতের
মাধ্যমেই পরস্পরের কাছে পৌঁছত। ছাহাবায়ে কেরাম নবী (স) থেকে
রেওয়ায়াত করতেন। কখনো তাঁরা পরষ্পর থেকে বর্ণনা করতেন। তাঁদের পর এলেন তাবেঈগণ। তাঁরা ছাহাবীদের থেকে রেওয়ায়াত করতেন। তখনো তাঁরাও পরষ্পর থেকে বর্ণনা করতেন। নিম্নে আমরা উল্লেখিত যুগের ব্যাপারে কিছুটা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার প্রয়াস পাব।
ক) রাসূলুল্লাহ্ (স) এর যুগে তাফসীর:
আল্লাহ্ তা’আলা পবিত্র কুরআন হেফাযত করার দায়িত্ব নিজেই নিয়েছেন। তিনি
এরশাদ করেন,
اِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا الذِّكۡرَ وَ اِنَّا لَهٗ لَحٰفِظُوۡنَ
অর্থ, “নিশ্চয় যিকির (কুরআন)
আমি নাযিল করেছি এবং আমিই তার হেফাযতকারী।” -(সূরা হিজর: ৯)
আর আল্লাহ তাঁর নবীকে দায়িত্ব দিয়েছেন কুরআনকে ব্যাখ্যা করার তথা তাফসীর করার। আল্লাহ্ বলেন,
بِالۡبَیِّنٰتِ وَ الزُّبُرِ ؕ وَ اَنۡزَلۡنَاۤ اِلَیۡكَ الذِّكۡرَ لِتُبَیِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ اِلَیۡهِمۡ وَ لَعَلَّهُمۡ یَتَفَكَّرُوۡنَ
অর্থ, “আর আমি আপনার নিকট কুরআন নাযিল করেছি, যাতে করে আপনি মানুষের নিকট ব্যাখা করেন, যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যাতে করে তারা তা নিয়ে গবেষণা করতে পারে।” (সূরা নাহাল- ৪৪)
এই কারণে ছাহাবায়ে কেরাম (রা) যখনই কুরআন বুঝার ব্যাপারে কোন অসুবিধার সম্মুখিন হতেন তখনই তাঁরা নবী (স) এর স্মরণাপন্ন হতেন ।
★ নবী (স) কুরআনের তাফসীর কি পরিমাণ করেছেন, সে ব্যাপারে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন: তিনি
ছাহাবীদের জন্য পূরা কুরআনের ব্যাখ্যা করেছেন। একথা বলেছেন ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ:)।
অন্যরা বলেছেন: তিনি কুরআনের খুবই
অল্প ব্যাখ্যা ছাহাবীদের জন্য পেশ করেছেন। তবে প্রাধান্য যোগ্য কথা হল, তিনি কুরআনের অধিকাংশ তাফসীর করেছেন- পূরা কুরআনের নয় এবং তা অল্পও নয়।
★ আর তাফসীরের ক্ষেত্রে রাসূল (স) এর নীতি ছিল যে, তিনি আয়াতের তাফসীর দীর্ঘভাবে করতেন না অথবা এমন কথা
বলতেন না যাতে কোন ফায়েদা নেই। তাঁর অধিকাংশ তাফসীর ছিল কোন সংক্ষিপ্ত বিষয়কে ব্যাখ্যা করা, অথবা কোন দুর্বোধ্য বিষয়ের সমাধান দেয়া, অথবা আম বা ব্যাপক কোন বিষয়কে খাছ বা বিশেষিত করা, অথবা কোন অর্থ বর্ণনা করা।
খ) ছাহাবায়ে কেরাম (রা) এর যুগে তাফসীর:
ছাহাবীগণ (রা:) ছিলেন প্রকৃত আরব জাতি। আরবী ভাষা এবং তার নিয়ম
অনুযায়ী তাঁরা খুব সহজে কুরআন বুঝতেন। কিন্তু যেহেতু কুরআনের ভাষাগত ও অলংকারগত মান সকল ভাষার উপরে, তাই কুরআনের অর্থ ও ভাব বুঝতে ও
অনুধাবন করতে তাদের মধ্যে বিভিন্নতা দেখা দিত। তাঁদের কেউ এমন বিষয়
তাফসীর করতেন যা অন্যের নিকট কঠিন ও জটিল মনে হত। কোন অর্থ যদি
তাঁদের কাছে জটিল মনে হত এবং তাঁদের মধ্যে থেকেই কেউ তা ব্যাখ্যা করে
দিবে এমন কোন ব্যক্তি না পেতেন, তখন তাঁরা রাসূল (স) কে জিজ্ঞেস করতেন। তখন তিনি তাদের জন্য তা ব্যাখ্যা করে দিতেন।
★ ছাহাবায়ে কেরাম (রা) এর তাফসীরের
ক্ষেত্রে বিভিন্নতার কারণ কয়েকটি-
১) বুঝ ও অনুধাবনের উপকরণের ক্ষেত্রে বিভিন্নতা। যেমন আরবীর ভাষাগত জ্ঞান।
২) রাসূল (স)এর সাথে থাকা এবং তাঁর মজলিস সমূহে উপস্থিত থাকার ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে বিভিন্নতা।
৩) শানে নুযূল সম্পর্কে জানার ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে পার্থক্য।
৪) শরঈ জ্ঞান সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে পার্থক্য।
৫) বুদ্ধি ও মেধাগত দিক থেকে তাঁদের মধ্যে পার্থক্য।
★ কুরআনের তাফসীরের ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম (রা) চারটি উৎসের উপর ভিত্তি করে তাফসীর করতেন। তা হলো-
আল কুরআনুল কারীম, নবী (স) বা তাঁর হাদীছ, ইজতিহাদ ও গবেষণা ও আহলে কিতাবদের রেওয়ায়াত।
কুরআনের তাফসীর আহলে কিতাবের রেওয়ায়াত দ্বারা করার ব্যাপারে
কথা হল, পবিত্র কুরআন কতিপয় বিষয়ে তাওরাত ও ইঞ্জিলের সাথে
ঐক্যমত হয়েছে- বিশেষ করে নবীদের কিচ্ছা-কাহিনীর ক্ষেত্রে। তবে সে
ক্ষেত্রে কুরআনের নীতি তাওরাত ও ইঞ্জিলের অনরূপ নয়। কুরআন বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বর্ণনা দেয় নি। কিচ্ছাগুলো সকল দিক থেকে পূর্ণভাবে বর্ণনা করে নি। মানুষের মন যখন কিনা সর্বদা পূর্ণতা ও অনুসন্ধানের দিকে ধাবিত হয়, তাই কতিপয় ছাহাবী এ কিচ্ছাগুলোর বর্ণনা পূর্ণ করতে যেয়ে আহলে কিতাবের মধ্যে থেকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের স্মরণাপন্ন হয়েছেন। যেমন- আবদুল্লাহ্ বিন সালাম, কা’ব আহবার প্রমূখ।
তবে তাফসীরের ক্ষেত্রে ছাহাবীদের আহলে কিতাবের স্মরাণপন্ন হওয়ার
তেমন কোন গুরুত্ব নেই, যেমন গুরুত্ব রয়েছে অপর তিনটি উৎসের
ক্ষেত্রে। কারণ তাওরাত ও ইঞ্জিল ইহুদী খৃষ্টানদের দ্বারা পরিবর্তিত হয়েছে।
তাই ছাহাবীগণ তাদের থেকে শুধু তাই গ্রহণ করতেন যা তাদের আক্বীদার
সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হত এবং কুরআনের সাথে মতবিরোধ পূর্ণ হত না। যে বিষয়ের মিথ্যাবাদিতা প্রমাণিত হত তাঁরা তা প্রত্যাখ্যান করতেন গ্রহণ করতেন না। আর যে বিষয়ে নীরবতা পাওয়া যেত (অর্থাৎ তা অস্পষ্ট) তা তাঁরা শুনতেন কিন্ত তা সত্য না মিথ্যা কোন কথা বলতেন না। এক্ষেত্রে
তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (স)এর এই বাণীর উপর আমল করতেন,
(بلغوا عني ولو آية وحدثوا عن بني إسرائيل ولا حرج من كذب علي متعمداً فاليتبوأ مقعده
من النار)
অর্থ, “আমার নিকট একটি আয়াত হলেও তোমরা তা অন্যের কাছে পৌঁছিয়ে দাও। বাণী ইসরাঈলদের থেকে হাদীছ বর্ণনা কর এতে কোন অসুবিধা নেই। যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে তার ঠিকানা জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়। -(ছহীহ্ বুখারী)
★ এসমস্ত ইসরাঈলী খবর (রেওয়ায়াত) সাক্ষ্য স্বরূপ উল্লেখ করা যায় বিশ্বাস করার জন্য নয়। এ খবরগুলি তিন প্রকারের। যথা-
ক) আমাদের হাতে যা রয়েছে তার মাধ্যমে যার সত্যতা আমরা জানতে পেরেছি। তা ছহীহ বলে বিবেচিত।
খ) যার মিথ্যা হওয়া আমাদের শরীয়ত দ্বারা জানতে পেরেছি। এই কারণে যে উহা আমাদের শরীয়তের বিরোধী। ইহা পরিত্যাজ্য।
গ) যে সম্পর্কে আমাদের শরীআত নীরব। অর্থাৎ যার সত্যাসত্য প্রমাণিত নয়। ইহা বর্ণনা করা যাবে- কোন সত্যায়ন বা মিথ্যায়ন ছাড়াই। আর এগুলোর অধিকাংশে কোন উপকার নেই। যেমন আছহাবে কাহাফ বা গুহাবাসীদের নাম, তাদের কুকুরটির রং, তাদের সংখ্যা, মূসা
(আ) এর লাঠি, উহা কোন গাছের ছিল, ঐ সমস্ত পাখির নাম যাদেরকে আল্লাহ জীবিত করে ছিলেন ইবরাহীম (আ) কে দেখানোর জন্য ইত্যাদি।
★ তাফসীরের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধি লাভকারি ছাহাবীর সংখ্যা খুব কম ছিল। তাঁরা
কুরআন সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন- নবী (স) হতে সরাসরী শুনে কিংবা মাধ্যম দিয়ে, অথবা তারা কুরআন নাযিলের যে
প্রেক্ষাপট প্রত্যক্ষ করেছিলেন তাদিয়ে, অথবা আল্লাহ তাদেরকে যে ইজতেহাদ বা গবেষণার ক্ষমতা দান করেছিলেন তাদ্বারা।
এঁদের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ ছাহাবী হলেন দশ জন। তাঁরা হলেনঃ চার খলীফা, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস, উবাই বিন কাব, যায়দ বিন সাবেত, আবূ
মূসা আশআরী, আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)
এঁরা ব্যতীত অন্যান্য ছাহাবীগণও তাফসীর করেছেন, তবে তাঁদের থেকে বর্ণিত বিষয় খুবই নগণ্য। এদশ জন ছাহাবী কম ও বেশী তাফসীর বর্ণনার দিক দিয়ে বিভিন্ন স্তরের। উক্ত দশজন ছাহাবীর মধ্যে থেকে অধিক হারে যারা তাফসীর বর্ণনা করেছেন তাঁরা ধারাবাহিকভাবে নিম্নরূপ-
ক) ইবনে আব্বাস, খ) ইবনে মাসউদ, গ) আলী বিন আবূ তালিব। ঘ) উবাই বিন
কাব। বাকি ছয় জন সল্প বর্ণনার দিকে থেকে সমপর্যায়ের।
ছাহাবী (রা) কর্তৃক বর্ণিত তাফসীরের বিধান:
ছাহাবীর তাফসীর দুই ভাগে বিভক্ত। যথা-
১) তাফসীর যদি এমন হয় যার মধ্যে ইজতেহাদের কোন অবকাশ নেই, যেমন
গায়েবী বা ভবিষ্যত সংক্রান্ত বিষয়, কুরআন নাযিলের প্রেক্ষাপট ইত্যাদি এসব
তাফসীর নবী (স) এর হাদীছের পর্যায়ভুক্ত, ইহা গ্রহণ করা ওয়াজিব।
২) তাফসীর এমন হয় যাতে ছাহাবীর ইজতেহাদ করার অবকাশ থাকে, তবে উহা ছাহাবীর উক্তি বলে পরিগণিত হবে- যতক্ষন তা রাসূলে (স) এর দিকে সম্পর্কিত না করবে। কতিপয় আলেমে দ্বীন ছাহাবীর মাওকুফ হাদীছ গ্রহণ
করা ওয়াজিব বলেছেন। কারণ তাঁরা বিভিন্ন অবস্থা ও প্রেক্ষাপটের প্রত্যক্ষদর্শী।
যা একমাত্র তাদের জন্য সম্ভব, অন্যদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।
★ ছাহাবীদের (রা) যুগে তাফসীরের বৈশিষ্ট:
১) সরলতা, এবং কাঠিন্য ও মতবিরোধের উর্ধে থাকা। সুতরাং হয় উহা কোন
বাক্যের ব্যাখা হত অথবা আয়াত থেকে সংগৃহীত কোন বিধান হত।
২) তাঁদের তাফসীর কুরআনের সকল আয়াতের ক্ষেত্রে ব্যাপক ছিল না। বরং
ঐসব আয়াতের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল যে সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে।
৩) সেকালে তাফসীর মৌখিকভাবে সংকলিত হত, তা লিখিত আকারে ছিলনা।
যদিও কেউ কেউ কিছু লিখেছেন, কিন্তু তা ছিল ব্যক্তি বিশেষের প্রচেষ্টা মাত্র। সে
যুগে (তাফসীর) লেখালেখির ব্যপকতা ছিল না।
৪) তাদের তাফসীর ইসরাঈলী বর্ণনা মুক্ত ছিল। কারণ বড়বড় ছাহাবী ছিলেন এর
মূল রেফারেন্স। আর আহলে কিতাব হতে সদ্য ইসলাম গ্রহণ কারি মুসলিমদের
তেমন মর্যাদা ও আসন ছিলনা, যাদ্বারা তাঁরা তাঁদের বর্ণনা প্রচার ও প্রসার করতে স্বক্ষম হতেন।
৫) ছাহাবী যুগের এই তাফসীর ফেক্বহী বিধি বিধান, হাদীছ, আক্বীদাহ, আচার
আচারণ, তারগীব ও তারহীব (উদ্দীপন ও ভীতি প্রদর্শন) প্রভৃতি দ্বারা সংমিশ্রিত
ছিল । কারণ সে যুগে ইসলামী জ্ঞান সমূহ স্বতন্ত্র আকারে বিভাজিত ছিল না ।
গ) তাবেঈদের (রহঃ) যুগে তাফসীর:
তাবেঈ তাদেরকে বলা হয় যারা ছাহাবীদের হাতে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন, এবং তাদের থেকে অধিকাংশ জ্ঞান অর্জন করেছেন। (তাদেরকেও তাবেঈ বলা হয় যাঁরা ইমানের সাথে ছাহাবীদের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেয়েছেন এবং ঈমানের অবস্থাতেই মৃত্যু বরণ করেছেন। তাদের কাছে তারা শিষ্যত্ব বরণ করুন বা না করুন।
তাবেঈদের যুগে তাফসীরের উৎস স্থল:
ক) কুরআন কারীম, খ) নবীর (স) সুন্নাত (হাদীছ), গ) ছাহাবীদের ইজতেহাদ, ঘ) আহলে কিতাবের রেওয়ায়াত, ঙ) তদুপরি তাদের (তাবেঈদের) ইজতেহাদ ও গবেষণা।
পূর্বেই আমরা বলে এসেছি নবী (স) ও ছাহাবী কর্তৃক বর্ণিত তাফসীর কুরআনের সকল আয়াতের ক্ষেত্রে ব্যপক ছিল না, বরং তাদের নিকট যেটা বুঝতে কঠিন হবে বলে অনুমিত হত তারই শুধু তাঁরা ব্যাখা করেছেন। অত:পর নবীর (স) যুগ হতে মানুষের দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে এই কাঠিন্য বৃদ্ধি হতে থাকে। সে কারণে তাবেঈগণ এই কাঠিন্যতা অনুপাতে তাফসীরের ক্ষেত্রে গবেষণা করতে বাধ্য হন।
এযুগে তাফসীরের কয়েকটি কেন্দ্র উদ্ভাবিত হয়। নবী (স) ও ছাহাবীদের যুগে আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদেরকে দুনিয়ার বহু এলাকার উপর বিজয় দান করেন। তাই ছাহাবীগণ নির্দিষ্টভাবে এক দেশে বসবাস করেননি। তাঁরা ইসলামী দেশ সমূহের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। একারণে তাঁদের মধ্য থেকে কেউ হয়েছিলেন শাসক, কেউ মন্ত্রী, কেউ ক্বাযী, কেউ শিক্ষক প্রভৃতি। তাঁরা বিজীত ঐসমস্ত দেশে তাদের স্বস্ব ধারণ কৃত ইলম বহন করেছিলেন। তাঁদের সংশ্রবে এসে তাবেঈগণ ইলম অর্জন করতেন।
এ থেকেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে এসব শহরে (ইসলামী) জ্ঞান কেন্দ্র, যার শিক্ষক ছিলেন ছাহাবীগণ (রা) এবং ছাত্র ছিলেন তাবেঈগণ। এই মাদরাসাগুলোর মধ্যে থেকে কিছু মাদরাসা তাফসীরের দিক থেকে প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং কিছু মাদরাসা ফিকহের দিক দিয়ে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
তাফসীরের দিক থেকে সুপ্রসিদ্ধ মাদরাসা ছিল তিনটি। তা হল-
১) মক্কা মুকাররামা:
এই মাদরাসার প্রতিষ্ঠা আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ)এর হাতে হয়েছিল। তাঁর শিষ্যদের অন্যতম ছিলেনঃ সাঈদ বিন জুবাইর, মুজাহিদ, ইকরিমা (ইবনু আব্বাসের ক্রিতদাস), তাউস বিন কায়সান আল ইয়ামানী, আত্বা বিন
আবূ রাবাহ।
২) মাদীনা আল মুনাওয়ারা:
ঐ সময় মদীনা ছিল খেলাফতে রাশেদার
রাজধানী। ওমর (রাঃ) বিজ্ঞ সাহাবীদেরকে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া মদীনা ত্যাগের
অনুমতি দিতেন না। যাতে করে তাঁরা তার মজলিশে শুরার তথা পরামর্শ বৈঠকের
সদস্য ও তার উপদেষ্টার ভুমিকা রাখতে পারেন। এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠালাভ করে উবাই বিন কা’ব (রা) এর হাতে। তার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছাত্রদের অন্যতম হলেন,
আবুল আলিয়া আররায়াহী, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, মুহাম্মাদ বিন কাব আল কুরাযী,
যায়দ বিন আসলাম প্রমূখগণ।
৩) কূফা নগরী:
উক্ত প্রতিষ্ঠান আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)এর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর সুপ্রসিদ্ধ ছাত্রদের অন্যতম হলেন, আলকামাহ বিন কাইস, মাসরূক ইবনুল
আজদা’, উবাইদাহ আস্ সালমানী, আল আসওয়াদ বিন ইয়াযীদ, আমর বিন
শুরাহবীল, আবূ আব্দুর রাহমান আস্ সুলামী, আমের আশ্শাবী প্রমূখগণ ।
তাবেঈ কর্তৃক বর্ণিত তাফসীর গ্রহণের বিধান:
এবিষয়ে ইসলমী বিদ্বানগণ মতানৈক্য পোষণ করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেন, ইহা গ্রহণ করা ওয়াজিব নয়। কারণ তারা না রাসুল (স) থেকে শুনেছেন
আর না তারা কুরআন নাযিলের সময় উপস্থিত ছিলেন বা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট প্রত্যক্ষ করেছেন। সুতরাং (কুরআনের) উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে যেয়ে তাদের ভুল ত্রুটি হওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া তাবেঈদের না্যয় পরায়নতা কুরআন-হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয় যেমনটি ভাবে প্রমাণিত রয়েছে ছাহাবীদের ক্ষেত্রে। অন্য বিদ্বানগণ বলেন, তাবেঈদের তাফসীর গ্রহণযোগ্য। কারণ তাঁরা এই তাফসীর সরাসরী ছাহাবায়ে
কেরাম (রা) থেকে নিয়েছেন, তাদের (ইলমী) বৈঠকে বসেছেন ও তাদের ইলম অর্জন করেছেন। তবে সব চেয়ে অগ্রাধিকার যোগ্য কথা হল এই যে,তাঁরা যদি কোন তাফসীরের ক্ষেত্রে ইজমা তথা ঐকমত্য পোষণ করেন তবে ঐ তাফসীর গ্রহণকরা ওয়াজিব, আর যদি তারা ভিন্ন মত পোষণ করেন তবে সে ক্ষেত্রে তাঁদের তাফসীর গ্রহণ করা ওয়াজিব নয় এবং তাদের একজনের কথা অপরজনের উপর দলীল হিসাবে প্রযোজ্য হবে না। এমতাবস্থায় কুরআনের ভাষার দিকে বা সুন্নাত তথা হাদীছের দিকে বা আরবদের সাধারণ ভাষা বা ছাহাবীদের কথার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
তাবেঈদের যুগে তাফসীরের বৈশিষ্ট:
তাবেয়ীদের যুগে তাফসীরের কিছু বৈশিষ্ট্য নিম্নে তুলে ধরা হলো-
১) ইহুদ-খৃষ্টানদের অনেকে ইসলামে প্রবেশ করার কারণে তাদের তাফসীরে
ইসরাঈলী বর্ণনার অনুপ্রবেশ।
২) বিজয় লাভের মাধ্যমে ইসলামী রাজ্য বিস্তার লাভের সাথে সাথে অনেক
অনারবের ইসলামে দিক্ষা লাভ করায় বহু সংখক আয়াতের তাফসীর করার
প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই তাবেঈগণ মানুষের প্রয়োজনানুপাতে তাফসীর
বর্ধিত করতে থাকেন। তাঁরা এযুগে তাফসীরের কাজ সম্পন্ন করেন। এভাবেই
সমূদয় কুরআনের তাফসীর সুসম্পন্ন হয়।
৩) এ যুগে তাফসীর পূর্বসূরীদের (ছাহাবীদের থেকে) থেকে গ্রহণ ও বর্ণনা দ্বারা সমৃদ্ধ ছিল।
৪) ছাহাবীদের (রা) যুগের তুলনায় এযুগে তাফসীরী মতবিরোধ বেশী পরিলক্ষিত হয়। এক আয়াতের ক্ষেত্রেই অনেক কথা ও তাফসীর পরিলক্ষিত হয়। অবশ্য উক্তি গুলি প্রায় পরস্পরের নিকটবর্তী ও সমার্থবোধক। সে কারণ বলা যায় যে, এগুলো ভাষাগত তারতম্য মাত্র, পরষ্পর বিরোধ পূর্ণ তারতম্য নয়।
৫) এ যুগে তাফসীর সনদ (সূত্র) সহ বর্ণনা করা হত। প্রত্যেক কথা সূত্র সহ তার
কথক পর্যন্ত সম্বন্ধ করা হত, যাতে করে সবল কথাকে দুর্বল কথা থেকে পৃথক
করা যায়।
দ্বিতীয় যুগ হলো তাফসীর লিপিবদ্ধ করণের যুগ:
তাফসীর লিপিবদ্ধ করণের সূচনা হয় তাবেঈদের শেষ যুগের দিকে (বনী
উমাইয়াদের শাসনামলের শেষের দিকে ও আব্বাসীদের শাষনামলের প্রথম দিকে।)
এযুগকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা যেতে পারে । তা হল-
ক) হাদীছের সাথে মিলিয়ে তাফসীর লিপিবদ্ধ করণ:
কেননা হাদীছই সর্বপ্রথ মলিপি বদ্ধ ও সংকলিত করা হয়। সেই সংকলন বিভিন্ন অধ্যায়কে শামিল করে, যার অন্যতম অধ্যায় ছিল এ তাফসীর । তাফসীরের জন্য আলাদা নির্দিষ্ট কোন গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করা হয়নি, যাতে কুরআনের প্রত্যেকটি সূরা ও আয়াতের সতন্ত্রভাবে তাফসীর করা হয়।
খ) সতন্ত্রভাবে তাফসীরের পুস্তক রচনা:
আল কুরআনের প্রত্যেকটি আয়াতের
তাফসীর তার বিন্যাস অনুপাতে করা হয়। ইহা সতন্ত্রভাবে আলাদা একটি বিদ্যা
(ইলমে তাফসীর) হিসেব প্রতিষ্ঠা রাভ করে যা ‘ইলমে হাদীছ’ পৃথক হয়ে যায়। সর্ব
প্রথম যাঁরা তাফসীরকে সতন্ত্র ভাবে লিখেন তাঁরা হলেন,
ইবনু মাজাহ্ (মৃত্যুঃ ২৭৩),
ইবনুজারীর আত্ব ত্বাবারী (মৃত্যুঃ ৩১৮), ইবনু আবীহাতিম (মৃত্যুঃ ৩২৭),
আবুশ্ শাইখ ইবনু হিব্বান (মৃত্যুঃ ৩৬৯ হি:) হাকিম (মৃত্যুঃ ৪০৫হি:)
আবূ বাকর ইবনু মারদুওয়াইহ (মৃত্যুঃ ৪১০হি:)
তাঁদের তাফসীর রাসূল (স) ও ছাহাবা (রা), তাবেঈন, তাবে তাবেঈন পর্যন্ত
সনদ (সূত্র) সহকারে সংকলিত। কোন কোন সময় বর্ণিত মতামত সমূহে (লেখকেরপক্ষ থেকে) প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আরো রয়েছে তাদের তাফসীরে বিভিন্ন বিধি বিধানের আবিস্কার, প্রয়োজনের সময় ইরাব তথা যের যবর প্রভৃতি দেয়া হয় বাব্যাকারণগত ব্যাখ্যা পেশ করা হয়। তাই তাদের তাফসীর বর্ণনা ভিত্তিক ছিল।
গ) বর্ণনা ভিত্তিক তাফসীর থেকে সনদ বাদ দেয়া। তারা সনদকে সংক্ষিপ্ত করেন।
বিভিন্ন মতামত কারো দিকে সম্পৃক্ত করণ ছাড়াই একত্রিত করেন। যার ফলে
হযবরলতা পরিলক্ষিত হয়। মনগড়া ও দূর্বল কথার অনুপ্রবেশ ঘটে। অশুদ্ধ বর্ণনা
হতে বিশুদ্ধ বর্ণনার কোন পার্থক্য করা হয়নি।
ঘ) তাফসীর বির রায়। এরপর তাফসীর বিল মাসূর তথা সালাফে ছালেহীন থেকে
বর্ণনা ভিত্তিক তাফসীরের উপর ক্ষান্ত না হয়ে তা বিবেক প্রসূত তাফসীরের দিকে
অগ্রসর হয়। এপ্রকার তাফসীরকে “তাফসীর বির্ রায়” বলে।
ঙ) ইসলামী সম্রাজ্য বিস্তার লাভের সাথে সাথে ফিক্বহ ও আক্বাইদ সম্পর্কিত
মাযহাবের সৃষ্টি হয়, মতবিরোধ বৃদ্ধি লাভ করে। তর্ক বিদ্যার ছড়াছড়ি শুরু হয়।
মাযহাবী গোঁড়ামী আত্ম প্রকাশ করে, বিবেক প্রসূত দর্শন বিদ্যা বর্ণনা ভিত্তিক
বিদ্যার সাথে সংমিশ্রিত হয়ে যায়। মুফাস্সিরগণ তাঁদের তাফসীরে ব্যক্তিগত মতের উপর নির্ভর করতে শুরু করে, তাদের মধ্যে ইলমী পরিভাষা ও মাযহাবী বিশ্বাস সমূহ জেঁকে বসে। প্রত্যেকে স্বীয় তাফসীরকে ঐ সব বিষয় দিয়ে ভরে দেয় যে বিসয়ে তার নিজস্ব বুৎপত্তি রয়েছে।
এজন্যই আকল প্রসূত বিদ্যার অধিকারীর
তাফসীরে বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের কথা প্রধান্য পেয়েছে। যেমন ফাখরুদ্দীন রাযীর
তাফসীর। ফিকাহবিদদের উপর ফিকাহ প্রাধান্য পেয়েছে। যেমন জাসসাস, কুরতুবী
প্রমূখগণ ।
অনুরুপ ভাবে ইতিহাসবিদের তাফসীরে কিছুছা কাহীনি ও খবর প্রাধান্য পেয়েছে। যেমন, সালাবী, খাযিন প্রমূখদের তাফসীর। বিদআত পন্থীগন আল্লাহ্
কালামের বাখা তাদের বাতিল মাযহাব মুতাবিক করতে শুরু করে। যেমন রুম্মানী,
জুব্বাই, কাজী আব্দুল জাব্বার, মুতাযিলা ফির্কার যামাখশারী, ইসনা আশারী শীআ
দলের আল্ কাশী, তাসাউফ পন্থী তথা সূফী যেমন ইবনে আরাবী ইঙ্গিত সুচক অর্থ নিজ মাযহাব মুতাবিক বের করে।
এতদাসত্বেও রয়েছে, ইলমে নাহু (আরবী ব্যাকরণ) ও বালাগাত (অলংকার শাস্ত্র)
সম্পর্কিত তাফসীর। এভাবেই তাফসীরের কিতাব সমূহ শুদ্ধ-অশুদ্ধ ও ভাল-মন্দ সব
রকম বিষয় বহন করতে শুরু করে। প্রত্যেক মুফাস্সির (স্বস্ব মাযহাব অনুযায়ী) আয়াত সমূহকে এমন বিষয়ের উপর প্রজোয্য করেছেন যার উপর মূলত: ঐ আয়াতগুলি প্রজোয্য হবার নয়। ইহা মূলতঃ স্বীয় মাযহাবকে জয়যুক্ত করার জন্য ও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কল্পে করা হত। (এভাবেই বিদআত পন্থী
মুফাস্সিরদের নিকট) তাফসীর তার আসল উদ্দেশ্য তথা মানুষকে হিদায়াত, দিক নির্দেশনা ও দ্বীন ইসলামের বিধি-বিধান শিক্ষা দেয়া ইত্যাদি বৈশিষ্ট হারিয়ে ফেলে।
এভাবেই ‘তাফসীর বির্ রায়’ বা বিবেক প্রসূত তাফসীর ‘তাফসীর বিল মা’ছূর’
বর্ণনা ভিত্তিক তাফসীরের উপর আক্রমন করে। পরবর্তী যুগ সমূহেও তাফসীরের
এ ধারা অব্যাহত থাকে।
চ) আধুনিক যুগের তাফসীর:
আধুনিক যুগের তাফসীরে নতুন পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট পরিদৃষ্ট হয়। এযুগের মুফাস্সিরগণ যুগের প্রয়োজনের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তাফসীরে তারা এমন সব বিষয় উল্লেখ করেন যা আল কুরআনে শামিল হয়েছে। যেমন- সামাজিক জীবনের ভিত্তি, ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধান ও অন্যান্য ইলমের মূল উৎস। এক্ষেত্রে তাফসীরুল জাওয়াহির, তাফসীরুল মানার ও তাফসীর যেলালুল কুরআন স্ববিশেষ উল্লেযোগ্য।
……فقط. والله اعلم بالصواب ……..
🖍️উত্তর লিখনে-
মুফতী রিয়াজুল ইসলাম হানাফী
মাদারীপুরী
👉🏿শরয়ী মাসয়ালার সামাধান জানতে যোগাযোগ করুন –
📱+8801339868000 (Contact+Imo+Whatsapp)
📧 contact.hanafifatawa@gmail.com



